চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
এলএনজি সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ বাড়াল কাতার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাতিলের সময়সীমা আবারও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল থাকতে পারে। এতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কাতারএনার্জির পক্ষ থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। কাতারি সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোর্স মেজারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাদের তালিকায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালি রয়েছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু দায় ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
গত শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহ বাতিলের সময়সীমা সেপ্টেম্বরের পরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। একই সময়ে পাকিস্তানি ক্রেতাদের জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত তাদের জন্য কার্গো বাতিলের প্রক্রিয়া চলবে।
আরও পড়ুন: ছাদে সোলার বসালে মিলবে প্রণোদনা, প্রজ্ঞাপন জারি
ইউরোপের ক্রেতারাও এরই মধ্যে এ ধরনের নোটিশ পেতে শুরু করেছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইতালিতেও কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
শুক্রবার ইতালির প্রতিষ্ঠান এডিসন জানায়, দেশটিতে কাতারএনার্জির এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার সময়সীমা নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইতালির আদ্রিয়াটিক এলএনজি রিসিভিং টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত আরও পাঁচটি কার্গো পাঠাতে পারবে না বলে কাতারএনার্জি তাদের জানিয়েছে। ফলে এ সরবরাহ-সংকটের সময়সীমা এপ্রিলের শুরু থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে।
এডিসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বাতিল হওয়া এলএনজি কার্গোর সংখ্যা ২৯টি। নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে তারা বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করছে।
আরও পড়ুন: বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না: তারেক রহমানকে ট্রাম্প
কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে হচ্ছে। কেউ অন্য জ্বালানিতে যাচ্ছে, আবার কেউ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক হামলা বাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে নিয়মিত এলএনজি কার্গো পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কাতার গত মার্চে প্রথমবার ফোর্স মেজার ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রতি মাসেই এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষণা ফেলো অ্যান-সোফি করবেউ ইউরোনিউজকে বলেন, রাজনৈতিক সমাধান কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রধান অংশীদারদের মধ্যে সমঝোতা না হলে এ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।
আরও পড়ুন: লক্কড়-ঝক্কড় বাস কীভাবে ফিরবে রাস্তায়?
তার মতে, স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রম ঠিক কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছেও নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটিকে মাসে মাসে সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি রপ্তানির মানচিত্রে কাতারের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল।
ইউরোনিউজের হিসাবে, গ্যাস বিক্রি কমে যাওয়ায় কাতারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি বা ২৪ বিলিয়ন ডলার।
কাতারের ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অন্যান্য এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। পাশাপাশি নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়ায়ও উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তারপরও বৈশ্বিক ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে অথবা বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার পরিবর্তে নিজেদের মজুত ব্যবহার করছে।
গবেষক অ্যান-সোফি করবেউয়ের আশঙ্কা, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দীর্ঘ সময় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস দেখা দিতে পারে।
তবে সব আমদানিকারক দেশের ওপর এ সংকটের প্রভাব এক রকম নয়। করবেউয়ের মতে, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে জাপান তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ দেশটি কাতার থেকে অপেক্ষাকৃত কম এলএনজি আমদানি করে এবং তাদের অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দাম তেল বা যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের মূল্যের সঙ্গে নির্ধারিত।
ইউরোনিউজকে করবেউ আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কার এই জলপথ দিয়ে চলাচল করলেও এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল অনেকটাই সীমিত। এসব জাহাজ বিশেষায়িত হওয়ায় সহজে বিকল্প পাওয়া যায় না। ফলে চলমান সংঘাতের মধ্যে এলএনজি পরিবহন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট, প্রধান নির্বাহী ও কাতার সরকারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সায়াদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, রাস লাফানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা অন্তত ১৭ শতাংশ কমে গেছে।
সূত্র: দোহা নিউজ, ইউরোনিউজ
