গ্যাস সংকটে বন্ধ ৪০০ পোশাক কারখানা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি সংকট, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্প কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিরা। এ সময় পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং তা মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিরা জানান, পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম কাজে লাগাতে পারছে। এর ফলে সময়মতো রফতানি আদেশের পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন অর্ডার হারানোর আশঙ্কাও বাড়ছে।
আরও পড়ুন: জনপ্রশাসনের প্রজ্ঞাপনে সচিব পদে রদবদল
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা লোকসান সামাল দিতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটা পণ্যের মূল্যে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কারখানার মুনাফা কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ অব্যাহত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
গ্যাস সংকট সমাধানে এফএসআরইউ বাড়ানোর প্রস্তাব
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির মতে, নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা হলে আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। ১৫০ থেকে ৫০০ কেজি বয়লার রয়েছে- এমন কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিজিএমইএ।
আরও পড়ুন: খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা
পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
পরিবহন ও লজিস্টিকস উন্নয়নের সুপারিশ
পোশাক রফতানির পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বড় কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি রয়েছে।
এ ছাড়া চলতি মূলধন ও বাণিজ্যঋণের সুদের হার কমানো এবং পোশাকশিল্পের জন্য বিশেষ পোস্ট-শিপমেন্ট অর্থায়ন সুবিধা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলে বরাদ্দ বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
এলডিসি উত্তরণের পর বাজার সুবিধা ধরে রাখার তাগিদ
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
একই সঙ্গে প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ দ্রুত নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ নেতাদের আশঙ্কা, পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি কারখানা বন্ধের কারণে কর্মসংস্থানের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাক্ষাতে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল শিল্পের সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ও তুলে ধরে। এর মধ্যে এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা এবং নন-বন্ডেড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রফতানির সুযোগ সহজ করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য শোনেন। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পকে দেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করেন। সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রপতি।
