ফুটবলের জাদুকর মেসির জন্মদিন আজ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
লিওনেল মেসি। ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল যদি শিল্প হয়, তবে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীর নাম লিওনেল মেসি। আর ফুটবল যদি এক মহাকাব্য হয়, তবে সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। রেকর্ড, ট্রফি, গোল কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের সীমা ছাড়িয়ে মেসি আজ এক প্রজন্মের স্মৃতি, আরেক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। তার খেলা দেখে কোটি কোটি মানুষ ফুটবলের প্রেমে পড়েছে, আর তাকে অনুসরণ করে অসংখ্য তরুণ গড়ে তুলেছে নিজেদের স্বপ্ন। সেই আর্জেন্টাইন জাদুকরের আজ ৩৯তম জন্মদিন।
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট ছেলেটির সামনে ছিল অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম আর সীমাবদ্ধতায় ভরা এক পথ। সেই শিশুটিই একদিন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার এবং কোটি মানুষের আবেগের প্রতীক হয়ে উঠবেন—এমনটা হয়তো তখন কেউই কল্পনা করতে পারেনি।
মেসির গল্প শুধু প্রতিভার নয়, সংগ্রামেরও। শৈশবে তার শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা ছিল পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। স্থানীয় ক্লাবগুলোও দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়নি। ঠিক সেই সময় তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে বার্সেলোনা। স্প্যানিশ ক্লাবটির হাত ধরেই বদলে যায় তার ভাগ্য।
প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, একটি ন্যাপকিন কাগজেই মেসিকে দলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি লিখে দিয়েছিলেন বার্সেলোনার কর্মকর্তারা। এরপর পরিবারসহ স্পেনে পাড়ি জমান কিশোর মেসি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। আজ সেই সিদ্ধান্তকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
লা মাসিয়া একাডেমিতে নিজেকে গড়ে তোলার পর খুব দ্রুতই মেসি বুঝিয়ে দেন, তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। ২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেকের পর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। পরবর্তী প্রায় দুই দশক ফুটবল বিশ্ব দেখেছে তার অসাধারণ আধিপত্য।
মেসি, জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বার্সেলোনা দলকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ক্লাব দলগুলোর একটি বলে মনে করেন। মেসির পায়ে এসেছে অসংখ্য শিরোপা, আর গোলের পর গোল করে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
একসময় এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, বল পায়ে নিলেই মেসি কিছু অসাধারণ ঘটাতে চলেছেন। ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে এগিয়ে যাওয়া, ক্ষুদ্র পরিসরে বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস কিংবা দূরপাল্লার শট—সবকিছু মিলিয়ে তিনি যেন ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত সাফল্যের বিচারে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নাম মেসি। রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর তার ঝুলিতে। পাশাপাশি রয়েছে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অসংখ্য কীর্তি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে একটি প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল—ক্লাব ফুটবলে সব জিতলেও আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি কোথায়?
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়, একের পর এক কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার—সব মিলিয়ে তাকে কঠিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি গল্প। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মহেন্দ্রক্ষণ।
অনেকের মতে, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তিগুলোর একটি হলো মেসির বিশ্বকাপ জয়। অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জিতেছেন ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে পূরণ করেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।
সেদিন তিনি শুধু একটি ট্রফিই জেতেননি, বরং বহু বছরের বিতর্কেরও ইতি টেনেছেন। মেসি কি সর্বকালের সেরা ফুটবলার—এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে বিশ্বকাপ জয়ের পর ফুটবল ইতিহাসের শীর্ষস্থানীয়দের কাতারে তার অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে।
আরো পড়ুন : মেসিকে বিয়ে করতে চাওয়া ১০০ বছর বয়সী ভক্ত কে?
৩৯ বছরে পা রাখলেও মেসির গল্প এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং চলমান বিশ্বকাপেই তিনি যেন নিজের মহাকাব্যের নতুন অধ্যায় লিখে চলেছেন। জন্মদিনের আগের ম্যাচে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ জয়। তার আগের ম্যাচে করেছিলেন হ্যাটট্রিকও। অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বে টানা দুই জয়ে ইতোমধ্যেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে আলবিসেলেস্তেরা।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে যাওয়া এই মহাতারকা আজও মাঠে নামলেই দর্শকদের প্রত্যাশা থাকে একটাই—তিনি হয়তো আবারও কোনো জাদু দেখাবেন। বয়স বাড়লেও তার প্রভাব কমেনি বরং প্রতিটি ম্যাচই মনে করিয়ে দেয়, এমন ফুটবলার যুগে যুগে একজনই জন্ম নেন।
রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। তাই মেসির জন্মদিন শুধু একজন খেলোয়াড়ের জন্মদিন নয় এটি ফুটবল নামের সুন্দর খেলাটির এক সোনালি অধ্যায়ের উদযাপন। আর এই বিশ্বকাপেই হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে তার জাদু দেখার সুযোগ পাচ্ছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ফলে ৩৯তম জন্মদিনের এই আয়োজন শুধু অতীতের গৌরবগাথা নয়, বর্তমানের বিস্ময় এবং ভবিষ্যতের অপেক্ষারও প্রতীক।
