ইরান যুদ্ধের ইতি টানতে 'হিমশিম খাচ্ছেন' ট্রাম্প
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ পিএম
ফাইল ছবি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত একদিন আগে ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
গত সোমবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পোস্টে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যয় বাবদ যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ওই ঘোষণার মাত্র একদিন পরই আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেন ট্রাম্প। শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে এর পরিবর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করার প্রস্তাব দেন তিনি।
মিত্রদের মধ্যে যারা এই চুক্তি স্বাক্ষর করবে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ করে দিবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক বসানোর বিষয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প যেভাবে পিছু হটেছেন, সেটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে তিনি রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন।
আরো পড়ুন: ফের ইরানের বন্দর অবরুদ্ধ করল যুক্তরাষ্ট্র
চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধটির ইতি টানতে মাসখানেক আগে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরমাধ্যমে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি দু'পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনার পথ তৈরি হয়েছিল।
এরপর দফায় দফায় আলোচনা হলেও যুদ্ধ অবসানের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। উল্টো দু'পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে জ্বালানির বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার শঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি তাদের মিত্র দেশগুলোতে পুনরায় ইরানি হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধটিকে আরও তীব্রতর করতে চাচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে।
এখন এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য তিনি অপ্রচলিত একটি উপায় খুঁজছেন।
এক্ষেত্রে ট্রাম্প সম্ভবত চান যে, এবারের সমাধানটি যেন ২০১৫ সালে বারাক ওবামার প্রশাসনের করা চুক্তির চেয়ে 'ভালো কিছু' দাবি করা যায়। কিন্তু এভাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
"আমার মনে হয়, এর সম্ভাব্য পরিণতি হলো কোনো সমাপ্তি না হওয়া," বলছিলেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিদ।
এমনটা মনে হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধটি একটি "ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে" পরিণত হয়েছে।
"আর এ ধরনের যুদ্ধগুলো সাধারণত দীর্ঘ হয়, লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে," যোগ করেন রোজমেরি কেলানিদ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, সেটির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশাটিও আপাতত খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলা চালানোর মধ্যেই মঙ্গলবার সকালে সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের একটি পোস্টে ট্রাম্প পুনরায় ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন।
জবাবে ইরানিরা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র ও তাদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়িয়ে দেয়। দু'পক্ষের এমন পাল্টা-পাল্টাই পদক্ষেপের ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল আবারও প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন: নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের ১৩০ মিলিয়ন ডলার জব্দ
প্রায় মাসখানেক সময় ধরে বারবার চালু ও স্থগিত হওয়া শান্তি আলোচনার মধ্যে দেশ দু'টির মধ্যে এমন কিছু সংঘাতের ঘটনা্ও ঘটেছে, যা 'যুদ্ধবিরতি'র সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সামরিকভাবে আমেরিকানরা ইরানি জাহাজ, বিমান এবং স্থাপনা ধ্বংস করার মতো কিছু লক্ষ্য পূরণে সফলতা পেলেও রাজনৈতিকভাবে সংঘাতটি নিরসন প্রশ্নে এখনও অনেক দূরে রয়েছে।
সামরিকভাবে কিছুটা দুর্বল করা গেলেও ইরান এখনও হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বজায় রেখেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের সামরিক অভিযান ব্যাপকভাবে ওই অঞ্চলে না বাড়ায়, তাহলে তারা ইরানিদের সেভাবে দমাতেও সক্ষম হবে না।
একদিন আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নতুন কৌশলের কথা জানিয়েছিলেন, যা সম্ভবত ছিল নিজ দেশের জনগণের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক তৎপরতাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি উপায়, সেটি পুরোপুরিভাবে নতুন প্রস্তাব ছিল না।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ট্রাম্প নিজেই বেশ কয়েকবার এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলেছেন।
তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব যখন ইরানের পক্ষ থেকে উঠেছিল, তখন গত জুনে বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
রুবিও বলেছিলেন, "আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ শুল্ক বা মাশুল আরোপ করতে পারে না। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনও সেটিই বলে। বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক নৌপথে এই নীতিই অনুসরণ করা হয় এবং এখানেও আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি।"
এরপর ট্রাম্প নিজেই একই ধরনের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তা থেকে সরে আসেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো কোনো সুস্পষ্ট কৌশল বা রূপরেখা নেই।
তাদের মতে, এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো সামরিক তৎপরতা আরও বাড়ানো, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিকল্প হলো এমন একটি সমাধানে সম্মত হওয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বৈরী হিসেবে বিবেচিত ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাই ক্ষমতায় বহাল থাকবে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো এলিয়ট আব্রামস বলেন, "আমরা আবার সেই পুরোনো অবস্থায় ফিরে এসেছি, যেখানে মূল প্রশ্ন একটাই—কার ধৈর্য বেশি? ইরানের, যারা তেল রপ্তানি করতে পারবে না; নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য দেশের?"
সূত্র: বিবিসি।
