সাপ মারতে বাংলাদেশি বেজি নিয়ে বিপদে জাপান, শেষমেশ যা ঘটল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সাপ আর বেজি জন্মসূত্রে একে অপরের চিরশত্রু। কিন্তু সাপের দৌরাত্ম্য কমাতে গিয়ে এই বেজি নিয়েই এক অভূতপূর্ব বিপাকে পড়েছিল জাপান।
বিষধর সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে দেশটির 'আমামি ওশিমা' দ্বীপে পরিবেশ কর্তৃপক্ষ উন্মুক্ত করেছিল একদল ক্ষিপ্রগতির বেজি। লক্ষ্য ছিল একটাই—প্রাকৃতিক উপায়েই সাপের রাজত্ব খর্ব করা। তবে চমৎকার এই পরিকল্পনাটিই পরবর্তীতে এক মহা বিপর্যয়ের রূপ নেয়। সাপের দাপট থামানো তো দূর, উল্টো বেজির বেপরোয়া তাণ্ডবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় দ্বীপটির বহু দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আকস্মিক সংকটের সূত্রপাত ঘটেছিল এই বাংলা থেকেই। ১৯১০ সালে তৎকালীন বাংলাদেশের গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকা থেকে ‘ছোট ভারতীয় বেজি’ নিয়ে যাওয়া হয় জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে। পরে সেখান থেকেই ১৯৭৯ সালে ৩০টির মতো বেজি এনে আমামি ওশিমা দ্বীপে উন্মুক্ত করা হয়।
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আমামি ওশিমা দ্বীপে অত্যন্ত বিষধর ‘হাবু’ সাপের উপদ্রব ছিল চোখে পড়ার মতো। বনাঞ্চল ও কৃষিজমিতে চলাচলের সময় স্থানীয়দের প্রাণভীতি লেগেই থাকত। সাপ নিধনে প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে বেজিকে উপযুক্ত মনে করে ওকিনাওয়া থেকে প্রথম চালানে প্রায় ৩০টি বেজি এনে দ্বীপে ছাড়া হয়।
আরো পড়ুন: ইমরান খানের মৃত্যুর গুঞ্জন, আসল তথ্য জানালো পাকিস্তান
তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কৌশলগত এক বিরাট ভুল রয়ে গিয়েছিল। বেজি প্রধানত দিনের আলোয় বিচরণ করে, অন্যদিকে হাবু সাপ মূলত নৈশচর—অর্থাৎ রাতে শিকার খুঁজে বেড়ায়। ফলে দুই প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ছিল অতি নগণ্য। সাপ নিধন না হওয়ায় সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যায় বাড়তে থাকে, আর খাবারের অভাবে বেজি অন্য সহজ শিকারের দিকে নজর দেয়।
স্থানীয় শিকারির অনুপস্থিতিতে হাজার বছর ধরে নির্ভয়ে বসবাস করা দ্বীপটির নিরীহ প্রাণীদের ওপর চড়াও হয় বেজি। ক্ষিপ্রগতির এই প্রাণীর আক্রমণে চরম ঝুঁকিতে পড়ে বিপন্ন ‘আমামি খরগোশ’, মাটিতে বাসা বাঁধা বিরল প্রজাতির পাখি, বিলুপ্তপ্রায় ব্যাঙ ও বিরল সব কীটপতঙ্গ। ফলে খুব দ্রুতই দ্বীপের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্য ভেঙে পড়ে।
মাত্র কয়েকটি বেজি দিয়ে শুরু হলেও দ্বীপটির অনুকূল পরিবেশে তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে দ্রুত গতিতে। দেখতে দেখতে একসময় তাদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেয় জাপান সরকার। ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বেজি তাড়ানোর অভিযান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে গঠিত হয় ‘আমামি মঙ্গুজ বাস্টার্স’ নামে এক বিশেষ টাস্কফোর্স।
পুরো দ্বীপজুড়ে প্রায় হাজার হাজার কৌশলগত ফাঁদ পেতে, নাইট-ভিশন ক্যামেরা বসিয়ে এবং প্রশিক্ষিত কুকুরের সহায়তায় বেজির গোপন ডেরাগুলো খুঁজে বের করা হয়। বহু বছরের নিরবচ্ছিন্ন এই বিশেষ অভিযানে ৩২ হাজারের বেশি বেজি বন্দি ও অপসারণ করতে সক্ষম হয় উদ্ধারকারী দলটি।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে এই অভিযান। অবশেষে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়—আমামি ওশিমা দ্বীপকে সম্পূর্ণভাবে বেজিমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ ৩১ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রামের সফলতায় দ্বীপটিতে আবার স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং ধ্বংসের মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছে স্থানীয় বিরল বন্যপ্রাণীরা।
যা ছিল সাপের প্রকোপ কমানোর নিরীহ চেষ্টা, সময়ের ব্যবধানে সেটিই হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরিবেশের জন্য এক বিরাট কালঘাম ছড়ানো চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের মাধ্যমে জাপান সরকার তাদের ঐতিহাসিক ভুলকে শুধরে নিতে পেরেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
