ঝালকাঠি পৌরসভা
৬ কোটির উন্নয়ন প্রকল্পে ‘অনিয়মের’ শেষ নেই
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ঝালকাঠি পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং সরকারি অর্থ লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পৌরবাসীর অভিযোগ, উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অধিকাংশ কাজই হয়েছে দায়সারা, নিম্নমানের এবং পরিকল্পনাহীনভাবে। এতে যেমন জনগণের ভোগান্তি বেড়েছে, তেমনি সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়মের কারণে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবাদ ও আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, বিষয়গুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে যে কোনো সময় নাগরিক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাল খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ঝালকাঠি চত্বর উন্নয়ন, নতুন গোরস্থান নির্মাণ, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাত নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন: ছদ্মবেশী সাংবাদিকের কাছ থেকে ঘুষ নিলেন পুলিশ, তোলপাড়
অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ 'পার্সেন্টেজ' না দিলে অনেক ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মানবিক সহায়তা ও দান-অনুদানের নামে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করে তার বড় একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলক বা ভিত্তিফলকে কোথাও বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। সচেতন মহলের ভাষ্য, প্রকল্পভিত্তিক অর্থ বরাদ্দের তথ্য গোপন রাখতেই পরিকল্পিতভাবে নামফলকে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার ও সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য পৌরসভার মতো ঝালকাঠি পৌরসভার মেয়রকে অপসারণ করে সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এরপর প্রশাসকের দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পৌর এলাকার সাতটি খাল খননের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সাতটির মধ্যে ছয়টি খালের খননকাজ শুরু হলেও মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি খালের কাজই শুরু করা হয়নি। এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে। বর্তমানে খালগুলো এলোমেলোভাবে খনন করে ফেলে রাখায় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ময়লা-আবর্জনায় খালগুলো প্রায় নর্দমায় পরিণত হয়েছে এবং মশার প্রজননকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ প্রকল্পে অর্ধেক পরিমাণ কাজও সম্পন্ন না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাস্তা কার্পেটিং, সিসি ঢালাই, ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার, ৮৫০ মিটার ড্রেন, ৫০০ মিটার ফুটপাত এবং ১১টি অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পৌরসভার জরুরি মেরামতের জন্য এডিবি প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পৃথকভাবে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৭৫ মিটার পিচঢালাই রাস্তার কার্পেটিং কাজও অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে পৌরবাসীর অভিযোগ, অধিকাংশ কাজই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারাভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প জেলার বাইরের প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
পৌর এলাকার কলেজ রোডের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত রাস্তার কার্পেটিং শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আস্তরণ উঠে যেতে শুরু করেছে। পৌরসভায় অনেক কাজ হয়েছে বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে জনগণের টাকায় নিম্নমানের কাজ করে উন্নয়নের নামে লুটপাট করা হয়েছে। এতে জনভোগান্তি আরও বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসিব হাওলাদার বলেন, খাল খননের নামে খালগুলো নষ্ট করে ফেলে রাখা হয়েছে। এখন সেগুলো মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঝালকাঠিতে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির পেছনেও এটি একটি কারণ হতে পারে। অন্যদিকে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব থেকেও খাল খননের নামে লাখ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
ঝালকাঠি জেলা স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ হাওলাদার বলেন, অকথ্য ভাষায় কিছু বলতে চাই কিন্তু পারি না। শহরের ৩ নম্বর কৃষ্ণকাঠি ওয়ার্ডের কবিরাজ বাড়ি রোডে ড্রেনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ না করে বিলাসিতার পাহাড় গড়েছে পৌরসভা।
ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম. রেজাউল হক রিজভী বলেন, খাল খননের প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী চলমান বিল দেওয়া হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যান্য কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও সাবেক পৌর প্রশাসক মো. কাওছার হোসেনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তার কোন সারা পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
