×

ময়মনসিংহ

সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক

শেরপুরে বন্যহাতির তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ১০ হাজার মানুষ

Icon

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

শেরপুরে বন্যহাতির তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ১০ হাজার মানুষ

ছবি: ভোরের কাগজ

সন্ধ্যা নামলেই গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী জনপদে নেমে আসে আতঙ্ক। ঘরবাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে নিরাপদে থাকার প্রস্তুতি নেন বাসিন্দারা। কেউ হাতে নেন মশাল, কেউ টর্চলাইট। আবার কেউ ঢাকঢোল কিংবা পটকা নিয়ে অপেক্ষা করেন বন্যহাতির পাল তাড়ানোর জন্য। কারণ, অন্ধকার নামার পরই খাবারের সন্ধানে পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল।

কখনো একসঙ্গে শতাধিক হাতি ঢুকে পড়ে ধানখেত, সবজির জমি ও কলাবাগানে। খেয়ে ও পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে কাঁচা-আধাপাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা। বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতির কারণে শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: নারীর সঙ্গে বিএনপি নেতার হোটেলে ‘রাতযাপন’, ছবি ভাইরাল

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়লে প্রথমে সবাই দলবদ্ধ হয়ে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। মশাল, টর্চলাইটের আলো, ঢাকঢোল ও পটকার শব্দে হাতি ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু কখনো এসব শব্দ ও আলোতে হাতির পাল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তখনই তৈরি হয় বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা। হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষের ওপর হামলা এবং হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

ছবি: ভোরের কাগজ

অন্যদিকে, ফসল রক্ষায় মরিয়া হয়ে কোনো কোনো কৃষক বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে রাখেন। এসব ফাঁদে পড়ে বন্যহাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার চেষ্টা থেকেই তৈরি হচ্ছে মানুষ ও বন্যহাতির মধ্যে সংঘাত, যা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে দীর্ঘদিনের সংকট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে গারো পাহাড় এলাকায় বন্যহাতির তাণ্ডবের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনের সঙ্গে হাতির সংঘাত একটি স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বন্যহাতির তাণ্ডবের কারণে পাহাড়ি এলাকায় গত দুই দশকে শত শত একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষ করতে সাহস পান না। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো হারাচ্ছে আয়ের প্রধান উৎস। বাড়ছে আর্থিক অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় টর্চলাইট, কেরোসিন তেলসহ হাতি তাড়ানোর বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এসব সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের অভিযোগ, সহায়তা বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় রসদ পাওয়া যায় না।

সংকুচিত হচ্ছে জীবিকার পথ

একসময় পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবিকার বড় অংশ নির্ভর করত বনজ সম্পদের ওপর। বন থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, বাঁশ-বেতের সামগ্রী তৈরি এবং কৃষিকাজ ছিল তাদের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাঁশবাগান কমে যাওয়া, বনজ সম্পদ আহরণে নানা সীমাবদ্ধতা, বন্যহাতির তাণ্ডব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে এসব মানুষের আয়ের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস এখনো কৃষি, বনজ সম্পদ ও দিনমজুরি। অথচ এসব এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। নাকুগাঁও স্থলবন্দর গড়ে উঠলেও সেটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। শিল্প-কারখানা ও বড় ধরনের কর্মসংস্থানমূলক প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। ফলে বছরের বড় একটি সময় শত শত মানুষ কর্মহীন থাকেন।

কর্মসংস্থানের সংকটের সঙ্গে বন্যহাতির তাণ্ডব যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে জমিতে ফসল ফলানোর ঝুঁকি, অন্যদিকে বিকল্প কাজের অভাব—দুইয়ের চাপে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো পড়ছে চরম আর্থিক সংকটে।

সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের দাবি 

শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ্ব মো, হযরত আলীও জেলা ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি সমাজসেবক তাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলছেন, শুধু হাতি তাড়ানোর জন্য টর্চলাইট, কেরোসিন কিংবা পটকা সরবরাহ করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

তাদের দাবি, হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণ, হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যসংকট দূর করার উদ্যোগ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ এবং হাতি তাড়ানোর নিরাপদ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প গড়ে তোলা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ সম্প্রসারণ এবং যুবকদের কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক  যুগ্ন আহ্বায়ক মো,আমিনুল ইসলাম বাদশাসহ আরো অনেকই বলেন,  পাহাড়ি মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা গেলে ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। এতে মানুষ ও হাতির সংঘাত কমানোর পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদের জীবনমানও উন্নত হতে পারে।

শ্রীবরদী  উপজেলার রানীশিমুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান  আব্দুল হামিদ বলেন, 

বন্যহাতির তাণ্ডবকে শুধু বন বিভাগের সমস্যা হিসেবে না দেখে এটি সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সমন্বিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য বন্যহাতির আবাসস্থল রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রুকুনুজ্জামান ও কাংশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদের মানুষের নিরাপত্তা, কৃষি ও জীবিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক  ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”তিনি বলেন এজন্য মানুষকে সচেতন  করে তোলার লক্ষ্যে  এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। কৃষকদের  ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। হাতিয়ার হয়ে পিষ্ট হয়ে মানুষের মুত্যু হলে তার পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনতে হাতির খাদ্য ভান্ডার গড়ে তোলার জন্য প্রস্তাব পাটানো হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতে খাস জমি বরাদ্দে সুপারিশের আশ্বাস ভূমিমন্ত্রীর

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতে খাস জমি বরাদ্দে সুপারিশের আশ্বাস ভূমিমন্ত্রীর

সিলেট সীমান্তে ২৯ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ

সিলেট সীমান্তে ২৯ লাখ টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ

প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তারে ৩ দিনের আল্টিমেটাম

সিলেটের ট্রিপল মার্ডার প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তারে ৩ দিনের আল্টিমেটাম

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, ১৪ জন গ্রেপ্তার

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, ১৪ জন গ্রেপ্তার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App