×

জাতীয়

নতুন কৌশলে দুর্বৃত্তরা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

নতুন কৌশলে দুর্বৃত্তরা

ছবি : এআই জেনারেটেড

সন্ধ্যা নামলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। কখনো মোটরসাইকেলে এসে, কখনো ফ্লাইওভার থেকে, আবার কখনো আড়াল থেকে বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। সড়ক, বিপণিবিতান, গণপরিবহন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে ধারাবাহিক এসব ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির খবর না মিললেও নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা।

চলতি মাসের প্রথম আট দিনে রাজধানীতে অন্তত ২৪টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি চারটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববার (৮ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাতটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই সন্ধ্যায় পল্লবী থানা প্রাঙ্গণ ও মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণ হয়। ভাটারায় একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

এর আগেও এক রাতেই রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় অন্তত আটটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—পরিকল্পিতভাবে কি রাজধানীতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে? এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, প্রতিশোধ, সংগঠিত নাশকতা নাকি অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এক সন্ধ্যায় একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ

রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ভাটারায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জলসিঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। একই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাতটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। টিএসসি এলাকায় পরপর দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর প্রশাসনিক ভবনের পাশে, ভিসি চত্বর, নীলক্ষেতসংলগ্ন মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জগন্নাথ হলের কাছাকাছি, শাহবাগ ও বাংলা একাডেমি এলাকাতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। টিএসসি এলাকায় ঘটনার পর দুজনকে আটক করে প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা।

এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পল্লবী থানা প্রাঙ্গণেও ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে এসআরবি-৪-এর একজন সদস্য সামান্য আহত হন। একই সময় মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ের সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

এর আগের দিন শনিবার রাত ১০টার দিকে মিরপুর-১২ এলাকায় পল্লবী মেট্রো স্টেশনের নিচে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। যাত্রা শেষে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটির পেছনের অংশে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। বাসের কর্মী ও স্থানীয়দের তৎপরতায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। একই রাতে বনানীর সেতু ভবনের কাছেও একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ভবনের গার্ডরুমের কাচ ভেঙে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ।

এদিকে একই রাতে মহাখালী বাস টার্মিনালে পার্ক করে রাখা সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। খবর পেয়ে রাত ১২টা ৫৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

পাঁচ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ

গত ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খিলগাঁও, আদাবর, শাহবাগ, বিমানবন্দর ও মিরপুরের কালশী এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরের পাশে বিস্ফোরণ হয়। আদাবর থানার সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। শাহবাগে পুলিশের টহল গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে জুলাই চত্বরের পাশেও বিস্ফোরণ ঘটে। বিমানবন্দর গোলচত্বর ও কালশী এলাকাতেও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। একই রাতে প্রগতি সরণির কোকা-কোলা মোড়ে বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।

এর আগে ২ নভেম্বর আগারগাঁও মেট্রোস্টেশনের নিচে ও ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ৪ নভেম্বর শেরেবাংলানগরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের বাইরে বিস্ফোরণ হয়। ৫ নভেম্বর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে পুলিশের টহল গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। একই দিন বাড্ডা, কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও হোটেলের বাইরে এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের কাছেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনার ভিত্তিতে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে অন্তত ২৪টি ককটেল বিস্ফোরণের হিসাব পাওয়া গেছে।

নাশকতার পেছনে আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে পুলিশ

ধারাবাহিক এসব ঘটনার পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগীদের দায়ী করছে পুলিশ। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের ভাষ্য, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে সামনে রেখে অস্থিতিশীলতা তৈরি ও জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটানো হতে পারে। পুলিশের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম সাত দিনে ককটেল বিস্ফোরণ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার পরও একের পর এক হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন জানান, বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ফুটেজে অনেক হামলাকারীর মাথায় হেলমেট দেখা গেছে। কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ হেঁটে এসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট থানা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা কার্যক্রমও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীতে পুলিশি তৎপরতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। মোবাইল পার্টি ও পিকেট ডিউটির পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক দূর করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রতিটি বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ। এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সদস্যও রয়েছেন।

ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাশকতা চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শুধু সিসিটিভি নয়, প্রয়োজন আগাম গোয়েন্দা নজরদারি

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী শনাক্তে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু ক্যামেরার ওপর নির্ভর করে অপরাধ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সন্দেহজনক তৎপরতা সম্পর্কে আগাম সতর্কতা।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীতে অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়েছে। ঘন ঘন বদলি, নতুন কর্মকর্তাদের এলাকায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব পালনের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ পুলিশের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করছে। ফলে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া গেলেও তা সব সময় মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর তদন্ত করা এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা এক বিষয় নয়। একটি কার্যকর পুলিশ ব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; কতটি অপরাধ আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হলো, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তাঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ

ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় লক্ষ্যবস্তু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক স্থাপনা হলেও এর ঝুঁকি বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। চলন্ত বাসে আগুন লাগলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা শ্রমজীবী মানুষ হতাহত হতে পারেন। সড়কে বিস্ফোরণ ঘটলে পথচারী, রিকশাচালক ও অন্য যানবাহনের যাত্রীরাও বিপদের মুখে পড়তে পারেন।

এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে সন্ধ্যার পর রাজধানীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জীবিকার প্রয়োজনে রাত পর্যন্ত কাজ করা মানুষ, গণপরিবহনের চালক-শ্রমিক, দোকানি ও কর্মজীবীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আতঙ্কের প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নগরজীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডেও।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করাও সমীচীন নয়। অপরাধের দায় নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করে প্রকৃত অপরাধী ও পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সূত্র: রূপালী বাংলাদেশ

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে সরাতে এবার অভিযান

সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে সরাতে এবার অভিযান

যাদুকাটায় ২৩ কোটি টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ, বিশেষ অনুমতিতে একক নিয়ন্ত্রণ

যাদুকাটায় ২৩ কোটি টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ, বিশেষ অনুমতিতে একক নিয়ন্ত্রণ

গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল ‌মোটরসাইকেল চালকের

গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল ‌মোটরসাইকেল চালকের

দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ৮৮

দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ৮৮

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App