যাদুকাটায় ২৩ কোটি টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ, বিশেষ অনুমতিতে একক নিয়ন্ত্রণ
রাসেল আহমদ, কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
‘ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট, ফিফটি ফিফটি’- সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি ঘিরে এমনই অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারার আলোচনা উঠে এসেছে কয়েকটি বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ ও কথোপকথনের রেকর্ডে। সরকারি নির্ধারিত ৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার রাজস্বের ৫৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ভাগ করার আলোচনা রয়েছে এসব রেকর্ডে। এমনকি এক ব্যক্তির হাতে ১৬ কোটি টাকা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে। তবে অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং কোনো লেনদেন হয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে প্রকাশ্য দরপত্র ছাড়াই ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে দেশের অন্যতম বড় এই বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা নাছির মিয়া। আগের ইজারায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি আদালতে গ্রহণযোগ্য না হলেও পরে তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত বিবেচনায় বালু উত্তোলনের একক অনুমতি দেওয়া হয়। এতে সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
নাছির মিয়া তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। গত ২২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশে চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি পান তিনি। গত সোমবার জেলা প্রশাসন তাঁকে দুই মহালের দখল বুঝিয়ে দেয়। আদেশ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বালু উত্তোলন করতে পারবেন। এর বিপরীতে সরকারি রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩২ বাংলা সনে দুটি বালুমহাল মোট ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। যাদুকাটা-১ ইজারা নেন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ এবং যাদুকাটা-২ নেন নাছির মিয়া। মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় ইজারা পাওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর তাঁরা মহালগুলোর দখল পান। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি জানিয়ে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন দুজন। প্রথমে তাঁদের পক্ষে আদেশ এলেও জেলা প্রশাসনের আপিলের পর ১৩ সেপ্টেম্বর আদালত তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি গ্রহণ করেননি।
এরপর জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধের বিজ্ঞপ্তি দেয় এবং অবশিষ্ট সময়ের জন্য খাস আদায়ের উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও তা স্থগিত হয়। এর মধ্যে দুই সাবেক ইজারাদারই ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর বিশেষ আদেশে শুধু নাছির মিয়াকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ শতাংশ ধরে রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের পর শাহ রুবেল আহমদ ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করলে মন্ত্রণালয়ের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে তিনি রিট প্রত্যাহার করেন। ১৫ অক্টোবর আরেক সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া একই বিষয়ে রিট করেন। ওই মামলায় দেওয়া স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা পরে ১৫ দিনের জন্য স্থগিত হলে প্রশাসন নাছিরকে মহালের দখল বুঝিয়ে দেয়।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশনার ভিত্তিতেই দখল হস্তান্তর করা হয়েছে। আইনগত ব্যত্যয়ের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য, মন্ত্রণালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ; তারা নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন। তবে প্রকাশ্য দরপত্রের উদ্যোগ কেন স্থগিত হলো, বিশেষ অনুমতির আইনগত ভিত্তি কী এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে আরও বেশি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ ছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
‘ফিফটি ফাইভ’ বিতর্কের সূত্র আরও গভীরে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রতিবেদকের হাতে আসা সিলেট, ঢাকা ও সুনামগঞ্জে অনুষ্ঠিত তিনটি বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ ও কথোপকথনের রেকর্ডে চার ব্যবসায়ীর আলোচনা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যাদুকাটার সাবেক এক ইজারাদার, দুই কয়লা ব্যবসায়ী ও ঢাকাকেন্দ্রিক এক বালু সরবরাহকারী। রেকর্ডে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ৫৫ শতাংশ ভাগ-বাঁটোয়ারা এবং ১৬ কোটি টাকা এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গ শোনা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, কথোপকথনের উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ও অর্থ লেনদেনের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
নাছির মিয়া আগের মেয়াদে ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ববঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, কর্তৃপক্ষ যথাযথ বিবেচনায় তাঁকে নতুন করে বালু উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছে এবং ইজারায় কোনো ত্রুটি নেই। সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলও ‘ফিফটি ফাইভ’ অভিযোগকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আগের সময়ের লুটপাট বন্ধ করে সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।
তবে বিতর্ক শুধু রাজস্ব বা ইজারা নিয়েই নয়, যাদুকাটার অস্তিত্ব ও পরিবেশও রয়েছে ঝুঁকিতে। স্থানীয় শ্রমিকদের অভিযোগ, নির্ধারিত বালুমহালের সীমানা স্পষ্ট না থাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালুর পাশাপাশি বালুমিশ্রিত পাথরও উত্তোলন করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু ও পাথর আহরণ হলেও রয়্যালটি আদায় এবং উত্তোলনের পরিমাণের স্বচ্ছ হিসাব নেই। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পাঁচ মাসে দুই মহাল ঘিরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের নথিতে ২০১১ সাল থেকেই যাদুকাটা নদীর পাড় কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজার ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী বসতি, নির্মাণাধীন সেতু এবং শিমুলবাগান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে তিন থেকে পাঁচ হাজার বারকি নৌকায় ১০ থেকে ১৫ হাজার শ্রমিকের জীবিকা এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে বালু উত্তোলন বন্ধের প্রশ্নে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ মিয়া বলেন, ইজারাপদ্ধতির পরিবর্তে সরকারি ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র চালু হলে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি নদী ও প্রকৃতি রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতা ওবায়দুল হক মিলনের মতে, নদীভাঙন ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে জনপদকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে যাদুকাটার বালুমহাল এখন শুধু একজন ইজারাদারের বিশেষ অনুমতির বিষয় নয়; এটি সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, রাজস্বের স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পরিবেশ সুরক্ষার বড় পরীক্ষা। কথিত ৫৫ শতাংশ ভাগ-বাঁটোয়ারার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিশেষ অনুমতির আইনগত ভিত্তি প্রকাশ, আগের রাজস্ব হিসাব নিরীক্ষা এবং নদীর সীমানা ও উত্তোলন কার্যক্রমের স্বচ্ছ নজরদারি নিশ্চিত না হলে ‘ফিফটি ফাইভ’ বিতর্কের আড়ালে যাদুকাটার সম্পদ লুণ্ঠন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
