রংপুরে চার খুন: পুলিশ ও ময়নাতদন্তের তথ্যে গরমিল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য ও ময়নাতদন্তের তথ্যে বড় ধরনের অমিলের অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে আসামির পোশাক, ঘটনার সময় বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং মোবাইল ফোন জব্দের বিষয়েও পুলিশের বক্তব্যে অস্পষ্টতা থাকায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, নিহত চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতদের একজনের চোয়াল ভেঙে দেওয়ার যে দাবি করা হয়েছিল, ময়নাতদন্তে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, নিহতদের মুখে রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের কোনো আলামত মেলেনি। কয়েক দিন মরদেহ পড়ে থাকায় পচন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণেই মুখমণ্ডলের চেহারায় পরিবর্তন হয়েছে। পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেছিলেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের তথ্য প্রকাশের পর পুলিশের ওই দাবির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের পোশাক নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। জেলা ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর পরনে থাকা প্রিন্টের শার্টের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্টের নকশার মিল পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: রাতের আঁধারে কলাবাগানে দুর্বৃত্তের তাণ্ডব, আতঙ্কে পরিবার
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস দাবি করেন, ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তার পরনে শুধু ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি ছিল। পরে কীভাবে তার গায়ে ওই শার্ট এল, তা তিনি জানেন না।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এটি একটি সাধারণ ব্র্যান্ডের শার্ট এবং একই নকশার পোশাক অনেকেরই থাকতে পারে। তার দাবি, সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তারের সময়ও ওই শার্টটি তার পরনে ছিল।
হত্যাকাণ্ডের সময় আসামিদের অবস্থান ও ঘটনাস্থল ছাড়ার সময় নিয়েও ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আসামিরা স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
তবে সিদ্ধার্থের বাবা দাবি করেছেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে ছেলে বাড়িতে খাওয়ার পর পাশের বাসায় যায় এবং শুক্রবার সকালে বাড়িতে নাশতাও করে। যদিও ওই প্রতিবেশী পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধার্থ তাদের বাসায় গিয়েছিল—এ দাবি অস্বীকার করা হয়েছে।
অন্যদিকে আরেক আসামি মুগ্ধ দাসের মা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতের পর শুক্রবার দুপুরে ছেলে বাড়িতে ফিরে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা বলেছিল।
ঘটনার পর নিহতদের মোবাইল ফোন এবং বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের স্বজন পূজা চক্রবর্তী জানান, শনিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের ফোন বন্ধ পেয়ে তিনি বাসায় যান। তখন বাড়িটি তালাবদ্ধ ও অন্ধকার ছিল।
আরও পড়ুন: এক ইলিশ বিক্রি হলো ৮ হাজার ৫০০ টাকায়
পুলিশ জানিয়েছে, আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে আসামিরা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল। তবে পরিবারের ব্যবহৃত মোট চারটি ফোনের মধ্যে বাকি দুটি ফোন কোথায় বা কার কাছে রয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়।
ওই ইলেকট্রিশিয়ানের দাবি, খুঁটি থেকে বাড়ির মেইন লাইনের সংযোগ খুলে ফেলা হয়েছিল। তার মতে, এটি স্বাভাবিক কোনো বৈদ্যুতিক ত্রুটি ছিল না। তবে এ বিষয়ে ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি তাদের জানা নেই।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। একই পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তবে ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যের অমিল, আসামির পোশাক নিয়ে বিতর্ক, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা, মোবাইল ফোন নিয়ে অস্পষ্টতা এবং আসামিদের গতিবিধি সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
