মায়ের সামনে মেয়েকে ও ছেলের সামনে মাকে খুন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফের সম্পর্ক জোড়া লাগানো গেলেও ক্ষোভ আর সহিংসতাকে আটকে রাখা গেল না। রাজধানীর কলাবাগানে স্বামী হৃদয় ইসলাম শিপনের হাতে স্ত্রী ফারজানা আক্তার রাত্রি ও শাশুড়ি ফিরোজা বেগম নিহত হওয়ার ঘটনায় মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেল দুটি পরিবার। নির্মম এ ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল মাত্র ৮ বছরের শিশু ইয়ামিন, যে নিজের চোখের সামনে মা ও বোনকে রক্ষা করতে না পেরে ছাদের এক কোণায় লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছিল। গতকাল রবিবার সকালে কলাবাগানের একটি বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পরে অভিযুক্ত শিপন নিজেই ১ বছরের বেশি বয়সী সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কলাবাগান থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
শিশু ইয়ামিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, গতকাল সকালে তার দুলাভাই শিপন রাত্রিকে নিজের বাসায় নিয়ে যেতে চাইছিলেন। এ সময় রান্নাঘরে নাশতা প্রস্তুত করছিলেন মা ফিরোজা বেগম। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শিপন ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রথমে রাত্রি ও পরে ফিরোজা বেগমকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করেন। ভয়ে ইয়ামিন ছাদের এক কোণায় গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে খালা ও বাবাকে খবর দেয়। পরে আহত ফিরোজা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান রাত্রি।
নিহত রাত্রির বাবা ফারুক হোসেন জানান, তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। গত সপ্তাহে স্ত্রী ও মেয়ে এক আত্মীয়ের বিয়েতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। শিপনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষ্য, বিয়ের দিন সকালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে শিপন কোনো খাবার না খেয়েই ঢাকায় ফিরে আসেন। পরে জানা যায়, নেশাগ্রস্ত দুই বন্ধুকে নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ফারুক হোসেন বলেন, পরে খবর পেয়ে বাসায় গিয়ে তিনি মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। স্ত্রী তখনো জীবিত ছিলেন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রায় ৫-৬ বছর আগে শিপন ও রাত্রির বিয়ে হয়। পরে পারিবারিক কলহে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। দুই পরিবারের উদ্যোগে তারা ফের সংসার শুরু করেন। সেই সংসারে জন্ম নেয় এক ছেলে, যার বর্তমান বয়স ১ বছর ২ মাস। ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, শিপন মাঝে মধ্যেই টাকার জন্য চাপ দিতেন। তিনি সব দাবি পূরণ করতে পারতেন না। এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে ছোট্ট নাতির ভবিষ্যৎ ভেবে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী ও শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যার পর শিপন নিজের ছোট সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বের হন। পরে সরাসরি কলাবাগান থানায় গিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করেন।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রাত্রির মরদেহ উদ্ধার করে। ফিরোজা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ঢামেক হাসপাতাল থেকে। দুজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো ও রাত্রির মা মেয়ের পক্ষ নিতেন। আজ (গতকাল) সকালের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শিপন বাসার সবজি কাটার ছুরি দিয়ে প্রথমে স্ত্রী ও পরে শাশুড়িকে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। তিনি জানান, ঘটনার পর সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত শিপন বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
