বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট
কয়েক গুণ বেড়েছে ওষুধের উৎপাদন খরচ, প্রভাব দামে
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য-উপাত্ত না থাকলেও উৎপাদন ব্যয় যে বেড়েছে তা নিশ্চিত করে বলা হয়। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে এই প্রভাব পড়বে ওষুধের দামের উপরও। তবে জীবনরক্ষাকারী এই পণ্য যাতে জনগণের কাছে সুলভমূল্যে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় সে বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি)।
গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাপি কার্যালয়ে স্বাস্থ্য বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে আয়োজিত ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই কথা জানান সংগঠনের নেতারা। সভায় বাপি’র সিনিয়র সহসভাপতি ও ইউনিমেড ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. মোসাদ্দেক হোসেন, মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান, সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন এবং বিএইচআরএফ’র সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম শুভ বক্তব্য রাখেন।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকে দুই কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার
হালিমুজ্জামান বলেন, ওষুধশিল্পের জন্য জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও ডিজেল দুই ক্ষেত্রেই শিল্পটি সমস্যায় পড়ছে। কারখানা চালানোর সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ ঘটলে কারখানায় জেনারেটর ও বড় ইউপিএস চালাতে হচ্ছে। গ্যাসের সংকট থাকায় জেনারেটরের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে ডিজেলের ওপর। এতে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ছে। এভাবে জ্বালানি ব্যয় বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে উৎপাদন খরচ সমন্বয়ে ওষুধের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সংকটের কারণে ওষুধ শিল্প খাতে লোকসানের পরিমাণ কেমন এ প্রশ্নের উত্তরে হালিমুজ্জামান বলেন, সার্বিক চিত্রের তথ্যটি এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে আমি যদি আমার কারখানার গত কয়েক মাসের তথ্যটি বলতে পারি। প্রতি মাসে ডিজেল খরচ বাবদ আমাকে ২ কোটি টাকা বেশি গুণতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সংকট প্রসঙ্গে ডা. মো জাকির হোসেন বলেন, ১৫ টাকা ছিল বিদ্যুতের সরকারি রেট, আমার ফ্যাক্টরির হিসাবে এখন আসছে ৪২ টাকা। অর্থাৎ ১৫ টাকার জায়গায় ৪২ টাকা হচ্ছে। ওষুধশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের বড় পার্থক্য রয়েছে। ওষুধের উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে তা মাঝপথে বন্ধ করা যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে কারখানাগুলোকে ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটর ও বড় ইউপিএস চালাতে হয়। গ্যাসের সংকট থাকায় জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ডিজেল মজুতের সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ট্যাংক শেষ হয়ে গেলে দ্রুত ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়।
তবে ওষুধের দাম নির্ধারণে শুধু জ্বালানি খরচ নয়, কাঁচামাল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ (আরঅ্যান্ডডি) বিভিন্ন খরচ যুক্ত রয়েছে বলে জানান বাপি’র নেতারা। সব মিলিয়ে জ্বালানি, কাঁচামাল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিটি খাতেই ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বাড়ায় তা সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় চাপ তৈরি করছে।
এদিকে বহুল ব্যবহারিত ওষুধ সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সুলভমূল্যে পৌঁছাতে সরকারকেই পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাপি’র নেতারা। তারা সতর্ক করে বলেন, দাম বেঁধে দিলে অনেক কোম্পানিই উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, এতে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ বাজার থেকে হারিয়ে চিকিৎসায় সংকট তৈরি হবে। চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশিয় কোম্পানিগুলো সরবরাহ করলেও কোম্পানিখাতে গ্যাসের সংকট, কাঁচামাল ও প্যাকেজিং ম্যাটারিয়ালের দাম বাড়ার কারণে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে এ খাত, এ অবস্থায় দাম নির্ধারণের আগে এ খাত সংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়ার দাবি জানা তারা।
আরও পড়ুন: তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্বর্ণের দাম
ডা. মো. জাকির হোসাইন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এমন ওষুধ, যা সবসময় বাজারে ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত ও সহজলভ্য থাকা প্রয়োজন। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়, তার বড় অংশই ইডিসিএল থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামও ‘এসেনসিয়াল ড্রাগস’। তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্বও তাদের ওপর দেয়া যেতে পারে। ইডিসিএল বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা পায়। সারাদেশে তাদের ৫টি উৎপাদন কারখানা রয়েছে। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতাও তাদের বেশি। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্ব ইডিসিএলকে দেয়া হোক। যে ঘাটতিটুকু থাকতে তা আমাদের কাছ থেকে নিক সরকার।
হালিমুজ্জামান বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব ওষুধের মান নিশ্চিত করে জনগণের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য। ১৯৯৪ সালে প্রণীত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার মধ্যে বর্তমানে খুব অল্পসংখ্যক ওষুধ উৎপাদনে রয়েছে। অনেক ওষুধ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। তাই সম্ভব হলে এসব ওষুধ ইডিসিএলের মাধ্যমে উৎপাদন করে জনগণের কাছে সুলভ মূল্যে, এমনকি বিনা মূল্যে বিতরণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন। কারণ বিশ্বের খুব কম দেশই ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে এবং বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর একটি। ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে আমাদের সরাসরি প্রতিযোগিতা রয়েছে। দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি কোম্পানিগুলো সেই জায়গা দখল করে নিতে পারে। তাই এমন কোনো নীতি নেয়া উচিত হবে না, যাতে দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে।
সভায় বাপির নেতারা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নেয়ার আহ্বান জানান।
