ইরান ইস্যুতে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইচ্ছুক: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি : সংগৃহীত
ইরান সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে তার অভিযোগ, তেহরান আলোচনায় আন্তরিক নয়। একই সময়ে সংঘাতের বিস্তৃতি বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বুধবার (২২ জুলাই) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকলেও ইরানের অবস্থান নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হলো, তারা আলোচনায় আন্তরিক নয়। তারা যদি আন্তরিক হয়, আমরাও প্রস্তুত। আর যদি না হয়, তাহলে নিজেদের এবং মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’
রুবিও বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া যাবে না। তার মতে, কোনো রাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করে টোল আদায় বা অর্থ না দিলে জাহাজে হামলার নজির তৈরি করে, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ চীন সাগরসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।
এদিকে মঙ্গলবার লোহিত সাগরে এশিয়াগামী সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার হঠাৎ পথ পরিবর্তন করে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হুথিরা সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। তারা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চলমান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হুমকির কারণে লোহিত সাগরই সৌদি তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। প্রতিদিন এ পথ দিয়ে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল সৌদি তেল পরিবহন করা হয়।
এর মধ্যেই সোমবার রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীরা ১০ দিনের নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি পাকিস্তর সফর করেছেন এবং ইসলামাবাদকে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সামরিক অভিযান থামেনি। মঙ্গলবার টানা ১১তম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। বুধবার ভোরে রাজধানী তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, রাজধানীর আকাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
আরো পড়ুন : ট্রাম্পের নতুন শুল্কে চাপে ভারতীয় ওষুধশিল্প
একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় শহর চাবাহার ও কোনারাকে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এছাড়া ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত বুশেহর শহরেও দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা।
এর আগে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরানের দাবি, বাহরাইনে অবস্থিত অ্যামাজনের আঞ্চলিক ডেটা সেন্টারের অবকাঠামোতেও তারা হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে অ্যামাজন কোনো মন্তব্য করেনি এবং রয়টার্সও স্বাধীনভাবে দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক দিনে জর্ডান ও ইরাকে ইরানের হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন।
সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বেড়েছে। মঙ্গলবার ২ শতাংশের বেশি বাড়ার পর বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে ওঠে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দামও আবার গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার হুথিরা জাহাজ মালিকদের উদ্দেশে এক চিঠিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, সৌদি তেল বোঝাই বা খালাস করা যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হবে।
এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, হুথিরা এখনো বাব আল-মান্দেব প্রণালি—যা ‘গেট অব টিয়ার্স’ নামে পরিচিত—বন্ধ করেনি। তবে তারা যদি এমন পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
হুথিদের হুমকির পর মঙ্গলবার চীন ও ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়া সৌদি অপরিশোধিত তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার ইয়েমেন উপকূলের দিকে না গিয়ে সুয়েজ খালের দিকে ঘুরে যায়।
যুদ্ধের সময় সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠিয়ে আংশিকভাবে সংকট মোকাবিলা করছিল। তবে হুথিরা যদি ওই বিকল্প রুটও পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে সৌদি আরবের অধিকাংশ তেল রপ্তানি আটকে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন হামলার হুমকি দেন। তার দাবি, ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন হামলায় ওই স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ইরান পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরো ৫০০ জন আহত হয়েছেন।
