যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে কারণে স্বর্ণ সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
এআই নির্মিত ছবি
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সপ্তাহে জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকায় সংরক্ষিত তাদের কয়েক টন স্বর্ণ সরিয়ে লন্ডনে নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির ভাষ্য, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে গুরুতর কোনো সংকট দেখা দিলে তারা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংকটের সময় স্বর্ণ দ্রুত ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য থাকবে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল? তারা কি সামনে বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি ঠিক এমন নয়। বরং অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠা বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণের মজুত কোথায় রাখবে, তা নতুন করে বিবেচনা করছে। বাণিজ্যিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় অনেক দেশই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে নিজেদের স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি রাখতে চাইছে।
এ বছরের শুরুতে ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বর্ণের একটি অংশ দেশে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। এর আগে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্ডেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে ১১১ টন এবং প্যারিস থেকে ১০৫ টন স্বর্ণ জার্মানিতে আনা হয়।
তবে সংকটের সময়ে স্বর্ণের সংরক্ষণস্থান পরিবর্তনের ঘটনা নতুন নয়। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেনের মতে, শীতল যুদ্ধের সময়ও ইউরোপের কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিউইয়র্কে সরিয়ে নিয়েছিল।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসিকে বলেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছু সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তবে স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে, সেটি নির্ধারণে এসব কারণ একেবারে শীর্ষে নেই। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায়—এমন স্থানে স্বর্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: ২০১৩ সালের চুক্তিতে হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে ভারত?
কাভাতোনির ভাষায়, কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে—এমনটা মনে করার কারণ নেই। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা, বাড়ানো এবং সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হচ্ছে।
লন্ডন কেন পছন্দের?
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বর্ণ এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা হয়েছে।
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন, তারা আশা করেন কখনো এসব স্বর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। তবে স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি বাড়ানোর জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র লন্ডনকে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো সংকটের সময় দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচার প্রয়োজন হলে লন্ডন থেকে তা তুলনামূলক সহজে করা সম্ভব। এ কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্ট দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ সংরক্ষণের অন্যতম জনপ্রিয় কেন্দ্র।
মধ্য লন্ডনে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের ভল্টে আনুমানিক চার লাখ স্বর্ণের বার রয়েছে, যার মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের শিল্পখাতভিত্তিক জরিপেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভল্টিং কেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বর্ণের সংরক্ষণস্থানে বৈচিত্র্য আনছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কোনো দেশের স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
সব স্বর্ণ কি বাস্তবে স্থানান্তর হয়?
আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থায় স্বর্ণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সবসময় শারীরিকভাবে বার এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে একই পরিমাণ নতুন স্বর্ণ কেনা হয়েছে। ফলে ওই পরিমাণ স্বর্ণ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পরিবহনের প্রয়োজন হয়নি।
তবে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে ‘বাহ্যিকভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে। পরে একই পরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়।
স্বর্ণ স্থানান্তরের মতো সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের ব্যবহৃত নিরাপত্তাব্যবস্থা বা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানায় না। তবে এ ধরনের কাজে নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার মাত্রা যে অত্যন্ত কঠোর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরও পড়ুন: ২০২৭ সালে গৃহযুদ্ধের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র
জোসেফ কাভাতোনি জানান, স্বর্ণ স্থানান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো এক জায়গায় স্বর্ণ বিক্রি করে অন্য জায়গায় সমপরিমাণ স্বর্ণ কেনা। এতে প্রকৃতপক্ষে কোনো শারীরিক পরিবহন ছাড়াই হিসাবের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্বর্ণের মালিকানা স্থানান্তর করা সম্ভব।
সীমান্ত পেরিয়ে স্বর্ণ পরিবহনের কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নেই। এর মধ্যে অন্যতম ব্রিংক’স গ্লোবাল সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটি বিবিসিকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে স্বর্ণ পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে।

ব্রিংক’সের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ার কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেন এত স্বর্ণ কিনছে?
স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার টন স্বর্ণ কিনেছে। এর আগের দশকে এই বার্ষিক গড় ছিল প্রায় ৫০০ টন।
এই প্রবণতার শিকড় বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পর্যন্ত বিস্তৃত। আগামী বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর দামও ধারাবাহিকভাবে নতুন রেকর্ড গড়েছে। জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়।
দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও সামরিক সংঘাত বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ বাড়ে।
মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারও স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। স্বর্ণের সরবরাহ সীমিত এবং হাজার বছরের ইতিহাসে এর মূল্য ধরে রাখার ক্ষমতার কারণে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিনিয়োগ ব্যাংক চার্লস শোয়াবের মতে, গত অর্ধশতকে স্বর্ণের দাম ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে।
এ বছরের শুরুতে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছে। তবে ঐতিহাসিক বিচারে এখনো তা উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আগস্টের দামের তুলনায় যা প্রায় ৩০০ ডলার বেশি।
থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা ভবিষ্যতেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকতে পারে।
সূত্র: বিবিসি।
