দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
মেসির রূপকথার করুণ সমাপ্তি, ফাইনালে ‘ভিলেন’ আর্জেন্টিনা
পাবলো ইগলেসিয়াস মৌরের
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আরেকটি অমর অধ্যায় লেখার স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। কোটি কোটি সমর্থকের প্রত্যাশা ছিল, বিদায়ের মঞ্চেও তিনি হয়তো উপহার দেবেন আরেকটি জাদুকরী মুহূর্ত। কিন্তু নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের আকাশে সূর্য যত পশ্চিমে হেলে পড়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে— এই রাতে মেসির পায়ে সেই পরিচিত জাদু নেই। স্পেন ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, আর ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনা যেন হারিয়ে ফেলে আত্মবিশ্বাসের শেষটুকুও।
পুরো টুর্নামেন্টে যে আর্জেন্টিনাকে দেখা গেছে, ফাইনালে সেই দলের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও আক্রমণাত্মক দল ছিল আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষকে কখন এবং কীভাবে আঘাত করতে হয়, তা তারা জানত। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, গোল করার সঠিক মুহূর্ত বেছে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা। সেই সামর্থ্য দিয়েই দুটি ম্যাচে বিপদ থেকে ফিরে তারা শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

বিশ্বকাপের ফাইনাল বরাবরই সতর্ক ও রক্ষণাত্মক হয়ে থাকে। তবে সেই মানদণ্ডেও এবারের ম্যাচ ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি নিষ্প্রাণ। প্রথমার্ধে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন রক্ষণ ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। অতিরিক্ত সময়ে তাদের পাওয়া গোল ম্যাচের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় অপ্রত্যাশিত ছিল না।
আরো পড়ুন: ফাইনালে হারার পর পুলিশের সঙ্গে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষ
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা গড়ে তো দূরের কথা, ইতিহাসেরই এক বিব্রতকর পরিসংখ্যানের অংশ হয়ে যায়। বিশ্বকাপের প্রায় একশ বছরের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে তারা ফাইনালের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শটও নিতে পারেনি। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও স্পেনের রক্ষণকে কার্যকরভাবে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি তারা।
মেসির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ফাইনালের আগে পুরো টুর্নামেন্টে তিনি নিজের সামর্থ্যের উজ্জ্বল প্রদর্শনী করেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের তালিকায় আর কিছু যোগ না হলেও তার কিংবদন্তি মর্যাদায় কোনো ঘাটতি পড়বে না। তবু এই ফাইনাল জিততে পারলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার নিয়ে বিতর্কে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতো—এ কথা বলাই যায়।
তবে এটাও সত্য, পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনাকে অনেকটা একাই টেনে নেওয়া মেসি ফাইনালে ছিলেন প্রায় নিষ্প্রভ। এর বড় কারণ অবশ্যই স্পেনের অসাধারণ রক্ষণভাগ। কিন্তু কেবল রক্ষণ দিয়েই তো সবসময় মেসিকে থামানো যায় না। স্পেন তা করেছে দলগত পরিকল্পনা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভুল কৌশলের সমন্বয়ে। ফলে শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, মেসিকেও তারা কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মেসির খেলায় সময় বরাবরই অন্যরকমভাবে কাজ করে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ছন্দ ভেঙে তিনি যেন নিজের গতিতেই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। বয়স বাড়লেও সেই ঝলক বহুবার দেখা গেছে। তার খেলা দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বার্সেলোনার সেই সোনালি দিনে। অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, সময় মেসিকে অতিক্রম করেনি; বরং তিনি সময়ের সঙ্গেই হেঁটেছেন। কখনো একটু পিছিয়েছেন, আবার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।
তবে এই ফাইনাল নতুন এক প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে—মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের কি এখানেই সমাপ্তি? অবশ্য এমন প্রশ্ন নতুন নয়। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরও তা উঠেছিল। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে সাময়িক অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পরও হয়েছিল একই আলোচনা। তখন অনেকেই বলতেন, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নন। এমনকি স্পেনে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি ‘যথেষ্ট আর্জেন্টাইন’ নন—এমন সমালোচনাও শুনতে হয়েছিল তাকে। সময় সেই বিতর্ককে অনেক আগেই অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।
আরো পড়ুন: ফাইনালে সবচেয়ে বড় ‘আকর্ষণ’ ছিলো ইয়ামালের ছোট ভাই
এই পরাজয় আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কারণ তাদের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। যদিও ফাইনালের আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং মেসি দুজনেই বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টে দল যা অর্জন করেছে, তাতেই তারা সন্তুষ্ট। তাদের কথায় ইঙ্গিত ছিল, ফাইনালের ফলাফল সেই সাফল্যকে ম্লান করতে পারবে না। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা প্রায়ই কথার চেয়ে কঠিন।

স্কালোনির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আর্জেন্টিনাকে একটি বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা এনে দিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ। তবু এই ফাইনাল ছিল তার সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যোগ করার সুযোগ। সেটি হাতছাড়া হওয়ায় তার কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম হতাশার ম্যাচ হিসেবেই এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় অপূর্ণতার বেদনা। আর্জেন্টিনা এবং মেসির রূপকথার সমাপ্তি যেভাবে কল্পনা করা হয়েছিল, বাস্তবতা তার ধারেকাছেও যায়নি। সোনালি সুযোগ কাজে লাগানো তো দূরের কথা, ফাইনালে নিজেদের সেরাটুকুও দেখাতে পারেনি তারা। আর সেই কারণেই এই ম্যাচ তাদের স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হয়ে থাকবে।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ান ইউএসের ফুটবল বিষয়ক প্রতিনিধি
