তিন দশক আগের নীতিতে ফিরল ওষুধশিল্প
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে ফের ১৯৯৪ সালের নীতির আওতায় ফিরেছে সরকার। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিল করেছে। ফলে ১৯৯৪ সালের আদেশে নির্ধারিত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল থাকছে।
১৯৯৪ সালে দেশে প্রথম অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়। তখন ১১৭টি ওষুধকে জরুরি হিসেবে নির্ধারণ করে এসবের দাম সরকারিভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তালিকাটি বাড়িয়ে ২৯৭টি করা হয়। তালিকা সম্প্রসারণের পর থেকেই এর আকার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিল ওষুধ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।
চলতি মাসের ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই বিধান অনুসরণ না করায় ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে।
তবে ১৯৯৪ সালের তালিকা বহাল থাকলেও সেটি স্থায়ীভাবে অপরিবর্তিত থাকবে না বলে জানিয়েছে সরকার। জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নিয়ে নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকে এমনভাবে ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: আদিবাসী পরিচয়কে বিভাজনের চোখে দেখার সুযোগ নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এরই মধ্যে ২০২৬ সালের নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। গত ২৯ জুন ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’-এর আওতায় জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়েছে।
বাড়তি দামে ভুগছেন রোগীরা
সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা আইনগত হলেও বাজারে ওষুধের দাম নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জরুরি ওষুধের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয় এমন রোগীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কয়েকটি বহুল ব্যবহৃত ওষুধের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। ইকোস্প্রিন, নাপা, লোসারটান, প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, মেট্রোনিডাজল, ফেক্সোফেনাডিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, মন্টিলুকাস্ট ও এসোমিপ্রাজলের মতো ওষুধের ক্ষেত্রেও দাম বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে।
ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের দাবি, কোম্পানিগুলো থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে বলেই খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। শাহবাগের এক ফার্মেসি কর্মী জানান, আগে যে নাপা সিরাপ ১৮ টাকা দামে কিনে ২০ টাকায় বিক্রি করা হতো, সেটি এখন প্রায় ৩১ টাকা দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে ৩৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরও পড়ুন: নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ঠেকাতে ১২ নির্দেশনা
অন্য এক ব্যবসায়ীও বলেন, কয়েক মাসের ব্যবধানে কিছু ওষুধের ক্রয়মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে খুচরা বিক্রেতাদেরও বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুকের মতে, ওষুধের বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নজরদারি জরুরি। তাঁর অভিযোগ, জরুরি ওষুধের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরীও জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, হাম ও ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি ওষুধের দামও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি নাপা সিরাপ ও সেকলোর বাড়তি দামের কথা উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে যা জানালেন জয়সওয়াল
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইভি ফ্লুইডসহ কিছু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর দামও এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি। ফলে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবারকে অন্যান্য খরচ কমাতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভিন্ন মত
অন্যদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ওষুধ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওষুধশিল্পে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ফলে তা কাটতে পারে।
তাঁর মতে, আইনি জটিলতা দূর হলে ওষুধশিল্পে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে এবং বাজারেও স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের আশঙ্কা, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সরকারি তালিকা পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষ নাও পেতে পারেন। তাদের মতে, শুধু তালিকা নির্ধারণ নয়, ওষুধের উৎপাদন, সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ ও খুচরা বাজার সব পর্যায়েই শক্তিশালী নজরদারি প্রয়োজন।
