আওয়ামী লীগের মিছিল আতঙ্কে পুলিশ কর্মকর্তারা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ গ্রাফিক্স
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এলাকার উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন নির্দেশনার পর চাপের মুখে পড়েছেন তারা। এরই মধ্যে এ ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া শুরু হয়েছে।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানসহ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঝটিকা মিছিল নিয়ে ওসি-ডিসিদের সতর্কবার্তা
সম্প্রতি ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত ও অপতৎপরতার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একটি ঝটিকা মিছিল করেন। এ ঘটনার জেরে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক আদেশে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর পৃথক আরেক আদেশে গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
আরো পড়ুন: সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান হান্নানের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ
এরপর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. সরোয়ার হোসাইনকে বদলি করে গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগের ডেমরা জোনাল টিমে পদায়ন করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পীকে গুলশান জোনের নতুন এডিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট আদেশে প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ধরপাকড় ও নজরদারি বাড়ানোর পরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। নতুন করে ধরপাকড় ও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়িয়ে আগাম তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদাও সমন্বিতভাবে কাজ এবং গোয়েন্দা তথ্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শুধু একটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে বলেই কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল কি না বা তিনি কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে পুলিশের চেকপোস্ট ও টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, ডিবি ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটলে বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
এসবি প্রধানসহ ১১ কর্মকর্তার রদবদল
পুলিশের শীর্ষ পর্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়।
আরো পড়ুন: জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্রদল নেতার পোস্ট, অতঃপর...
রদবদলের মধ্যে বিশেষ শাখার (এসবি) নেতৃত্বে পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে এসবির প্রধান করা হয়েছে। এতদিন এসবির অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। আর পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি মোহাম্মদ মুসলিমকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নতুন পরিচালক করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসানকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল এবং সারদার প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমানকে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি করা হয়েছে।
এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলীকে রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর মেট্রোরেলের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমানকে এসবির ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে এসব পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থে’ আদেশ জারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার
‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’ এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে তাকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়।
অডিওতে ‘মনির’ নামে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও দাবি করা হয়। এ ছাড়া পদায়নের জন্য অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও করা হয়। এসব বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ওসি রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহারের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
